রিয়াদ আলমের যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে কিছু কথা….

প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে (আমেরিকায়) স্থায়ীভাবে বসবাসের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অন্তত দশবার ভাবুন

— রিয়াদ আলমের যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে কিছু কথা

আমেরিকা পৃথিবীর অন্যতম সম্ভাবনার দেশ। এখানে কঠোর পরিশ্রমের মূল্য আছে, আইনের শাসন আছে, উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা আছে, বিশ্বমানের শিক্ষা আছে, নিরাপত্তা আছে এবং নিজের যোগ্যতায় স্বপ্ন পূরণের অসংখ্য সুযোগ রয়েছে। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো মানুষ এই দেশে আসে একটি সুন্দর ভবিষ্যতের আশায়। অনেকেই সফল হয়, নিজের পরিবারকে সুন্দর জীবন উপহার দেয়, নতুন ইতিহাস গড়ে।

কিন্তু একটি বাস্তবতা আছে—যা কোনো ভিসা অফিস, কোনো ইমিগ্রেশন ওয়েবসাইট কিংবা সফলতার গল্প পুরোপুরি বুঝিয়ে দিতে পারে না।

একদিন হয়তো আপনি উপলব্ধি করবেন—আপনি শুধু একটি দেশ পরিবর্তন করেননি, আপনি আপনার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান একটি অধ্যায় পেছনে ফেলে এসেছেন।

যে উঠোনে আপনার শৈশব কেটেছে, যে মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে বিকেল কাটিয়েছেন, যে মসজিদে নামাজ পড়েছেন, যে চায়ের দোকানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিয়েছেন, যে মানুষগুলো আপনাকে নাম ধরে চিনত—সবকিছু ধীরে ধীরে স্মৃতির অ্যালবামে বন্দি হয়ে যাবে।

সময় থেমে থাকবে না।

বাবা-মায়ের চুল আরও সাদা হবে। মুখে বয়সের ছাপ গভীর হবে। ফোনের ওপাশ থেকে তাঁরা বলবেন, “আমরা ভালো আছি, তুমি নিজের খেয়াল রেখো।” কিন্তু আপনি বুঝবেন, এই একটি বাক্যের আড়ালে কত শত না বলা অপেক্ষা, অভিমান আর ভালোবাসা লুকিয়ে আছে।

হয়তো কোনো একদিন গভীর রাতে একটি ফোনকল আসবে। খবরটি শুনে পৃথিবী যেন মুহূর্তেই থেমে যাবে। যাকে শেষবারের মতো একবার জড়িয়ে ধরতে চেয়েছিলেন, তিনি আর নেই। তখন হাজার হাজার মাইল দূরে দাঁড়িয়ে আপনার সবচেয়ে বড় অসহায়ত্ব হবে—শেষবারের মতো তাঁর হাতটি ধরে বলতে পারবেন না, “আমি এসে গেছি।”

ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন, শৈশবের বন্ধু—সবাই আপনাকে ভালোবাসবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দূরত্ব এমন এক নীরব দেয়াল তৈরি করবে, যা ভালোবাসা দিয়েও সবসময় অতিক্রম করা যায় না।

তারপর শুরু হবে আরেকটি বাস্তবতা।

আপনার সন্তান আমেরিকাতেই বড় হবে। তাদের ভাষা, চিন্তাধারা, সংস্কৃতি, জীবনযাপন—সবকিছুই হবে এই দেশের পরিবেশে গড়ে ওঠা। আপনি যতই বাংলাদেশের গল্প শোনান, তাদের কাছে বাংলাদেশ হবে বাবা-মায়ের স্মৃতির দেশ; কিন্তু আপনার মতো অনুভূতির দেশ নাও হতে পারে।

হয়তো প্রতি বছর কিংবা দুই-তিন বছর পরপর বাংলাদেশে আসবেন। বিমানবন্দরে নেমে মনে হবে—সবকিছু আগের মতোই আছে। কিন্তু কিছুদিন পরই বুঝবেন, অনেক কিছু বদলে গেছে। যে বাড়িটিকে একদিন নিজের পৃথিবী ভাবতেন, সেখানে এখন আপনি অতিথি। আত্মীয়রা আপনাকে ভালোবাসবে, কিন্তু আপনার প্রতিদিনের জীবন আর সেখানে নেই।

আমেরিকার ব্যস্ত শহরে কোনো এক বর্ষার দিনে হঠাৎ বৃষ্টির গন্ধ পেলে, কিংবা দূরে কোথাও আজানের ধ্বনি শুনলে, অথবা শীতের সকালে কুয়াশার ছবি দেখলে—আপনার মন উড়ে যাবে হাজার হাজার মাইল দূরের বাংলাদেশের কোনো গ্রামের পথে, শৈশবের সেই পরিচিত স্মৃতির কাছে।

এমন নয় যে আমেরিকা খারাপ।

বরং আমেরিকা আপনাকে সম্মান, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা এবং অসংখ্য সুযোগ দিতে পারে। এখানেই আপনি বাড়ি কিনবেন, গাড়ি কিনবেন, ভালো চাকরি করবেন, ব্যবসা করবেন, সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়বেন। হয়তো আর্থিকভাবে জীবনের অনেক স্বপ্ন পূরণ করবেন।

কিন্তু জীবনের একটি পর্যায়ে এসে অনেক প্রবাসী অনুভব করেন—সবকিছু অর্জনের পরও হৃদয়ের কোথাও একটি নীরব শূন্যতা থেকে যায়। সেই শূন্যতার নাম—জন্মভূমি, আপন মানুষ, শৈশবের স্মৃতি এবং ফেলে আসা সময়।

তাই যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শুধু ডলার, চাকরি, বাড়ি কিংবা নাগরিকত্বের কথা ভাববেন না। ভাবুন আপনার বাবা-মা, পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, শিকড়, স্মৃতি এবং হৃদয়ের কথাও।

কারণ আমেরিকায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত শুধু অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি মানসিক, পারিবারিক, সাংস্কৃতিক এবং আবেগের সিদ্ধান্ত।

স্বপ্ন দেখুন। কঠোর পরিশ্রম করুন। সফল হোন। পৃথিবীর যেখানেই থাকুন, নিজের দেশকে ভালোবাসুন।

কারণ একজন মানুষের প্রথম পরিচয় তার জন্মভূমি।

বাংলাদেশের মাটি, মানুষের ভালোবাসা, গ্রামের পথ, শৈশবের স্মৃতি, ঈদের আনন্দ, বর্ষার বৃষ্টি, আজানের ধ্বনি—এসব এমন সম্পদ, যার মূল্য প্রবাসে গিয়েই সবচেয়ে বেশি উপলব্ধি করা যায়।

প্রবাসে জীবন নিঃসন্দেহে সুন্দর হতে পারে। কিন্তু জন্মভূমির শূন্যস্থান—পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত দেশও পুরোপুরি পূরণ করতে পারে না।

রিয়াদ আলম

Loading

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *